বইয়ের পরিচয়

"কেয়াপাতার নৌকো" কেয়াপাতার নৌকো বই এর ফ্লাপের লেখাপদ্মা-মেঘনা-ধলেশ্বরী-কালাবদর এবং শত জলধারায় বহমান অজস্র নদী, খালবিল, অফুরান শস্যক্ষেত্র, নানা বর্ণময় পাখি-ফুল- বৃক্ষলতা—এই সব মিলিয়ে সেদিনের পূর্ববাংলা ছিল নিসর্গের এক মায়াময় ভূখন্ড। বাতাসে বাতাসে তখন জারি-সারি-ভাটিয়ালির সুর। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তখন বড়ই মধুর, আবিলতায় ভরে যায় নি। হিন্দু-মুসলমান, দুই সম্প্রদায় ছিল পরস্পরের পাশাপাশি। তাদের মধ্যে অনেক সময় মতান্তরও নিশ্চয়ই ঘটেছে, মনান্তরও। কিন্তু ছিল না তীব্র বিদ্বেষ। এই পটভূমিতে বিনু নামে এক বালকের বড় হয়ে ওঠা। আবহমান কালের শান্তস্নিগ্ধ রমণীয় পূর্ববাংলা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকেই উত্তাল হয়ে উঠতে শুরু করে। এদেশে যুদ্ধ হয় নি; কিন্তু আমেরিকান এবং ব্রিটিশ সৈন্যে ছেয়ে গেল চারিদিক। তাদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ল নানা ধরনের বিষ। এল কালোবাজারি, মজুতদারি, মানুষের তৈরি কৃত্রিম খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ, মূল্যবোধের চরম বিনাশ, লক্ষ লক্ষ মানুষের অনাহারে মৃত্যু। যুদ্ধশেষে ইংরেজরা দু'শো বছরের ভারতীয় উপনিবেশ ছেড়ে চলে যাবে। তার আগেই আরম্ভ হল দাঙ্গা। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এতকালের সম্পর্ক লহমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তখন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শুধুই ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং চরম শত্রুতা। বিষবাষ্পে ছেয়ে গেল দশ দিগন্ত। দাঙ্গায় খুন হল হাজার হাজার মানুষ, লুট হল অসংখ্য তরুণী। পুড়ে ছাই হল নগর-বন্দর, শত সহস্র জনপদ । তখন শুধুই হত্যা, রক্তপাত, ধর্ষণ। ভারত নামে এই দেশটি, বিশেষ করে পূর্ববাংলা যেন আদিম বর্বর যুগে ফিরে গেছে। দাঙ্গার পরে পরেই দেশভাগ। বিনুর প্রিয় নারী ঝিনুক ধর্ষিত হয়েছে। প্রায়-অপ্রকৃতিস্থ ঝিনুককে নিয়ে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর সঙ্গে এপারে চলে আসে বিনু। পশ্চিমবঙ্গও তখন উথালপাতাল। একদিকে জাতির জীবনে মহাসংকট, অন্যদিকে ঝিনুককে নিয়ে বিনুর ব্যক্তিজীবনে নানা অভিঘাত। এইসব নিয়ে ‘কেয়াপাতার নৌকো’ বিশাল পরিসরে শুধু মহাকাব্যিক উপন্যাসই নয়, বাঙালি জাতির চরম দুঃসময়ের এক মহামূল্যবান ইতিহাসও।

লেখক পরিচিতি

প্রফুল্ল রায়

1934 – 2025

প্রফুল্ল রায় (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ — ১৯ জুন ২০২৫) পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান সমসাময়িক লেখক, যিনি ১৯৩৪ সালে প্রাক্তন পূর্ব বাংলার ঢাকা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে তিনি ভারতে আসেন। একটি নতুন ভূমিতে পা রাখার জন্য তাকে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে। সংগ্রামরত মানুষের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তিনি সারা দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। আর এই উদ্দেশ্যই তিনি বেশ কিছুকাল নাগাল্যান্ডের আদিবাসীদের মধ্যে বাস করেছিলেন, যারা ছিলো বিহারের অস্পৃশ্য এবং আন্দামানের মূল ভূখণ্ডের শিকড়হীন মানুষ। যাদের অধিকাংশই পরবর্তীকালে তাঁর লেখায় নিশ্ছিদ্রভাবে আবির্ভূত হয়। ২০২৫ সালের ১৯ জুন তিনি ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেন।

উইকিপিডিয়ায় আরও পড়ুন ↗ সব বই দেখুন →