বাঙলার সূফী সাহিত্য (আহমদ শরীফ)
পৃষ্ঠা: 324
ISBN: 9788189863654
বইয়ের পরিচয়
বাঙলার সূফী সাহিত্যভূমিকাবাঙলাদেশে সূফীতত্ত্ব ও সূফী-সাধনা একটি স্থানিক রূপ লাভ করেছিল। বৈদান্তিক সর্বেশ্বরবাদ বা অদ্বৈততত্ত্ব ও যোগের প্রত্যক্ষ প্রভাবই এর মুখ্য কারণ। অবশ্য মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধমত ও বৌদ্ধ ভিক্ষুর প্রভাবে সিরিয়া, ইরাক ও ইরানে গুরুবাদী, বৈরাগ্য-প্রবণ ও দেহচর্যায় উৎসুক কিছু সাধকের আবির্ভাব বারো শতকের আগেই সম্ভব হয়েছিল। ইরান ও বলখ অঞ্চলের ভাবপ্রবণ লোকমনে বৈদান্তিক সর্বেশ্বরবাদের প্রভাবও পরোক্ষ মানসক্ষেত্র রচনায় সহায়তা করেছিল বলে মনে করি ।তাই ভারতে যে-সব সূফী সাধক প্রবেশ করেন, ভারতিক অধ্যাত্ম তত্ত্ব ও সাধনার প্রভাব এড়ানো তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাঁদের কাছে দীক্ষিত দেশী জনগণ ও পূর্ব-ঐতিহ্যসূত্রে প্রাপ্ত অদ্বৈতচেতনা ও যোগপ্রীতি ত্যাগ করতে পারেনি। বিশেষ করে বিলুপ্ত বৌদ্ধ সমাজের ‘যৌগিক-কায়-সাধন’ তত্ত্ব তখনো জনচিত্তে অম্লান ছিল। ফলে “সূফীমতের ইসলাম সহজেই এদেশের প্রচলিত যোগমার্গ ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক সাধনমার্গের সঙ্গে একটা আপোষ করে নিতে সমর্থ হয়েছিল।” একই কারণে ও পরিবেশে পরবর্তীকালে সূফীবাদের সামঞ্জস্য হয়ে সহজিয়া ও বাউল সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়।ব্রাহ্মণ-শৈব ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক সহজিয়ার সমবায়ে গড়ে উঠেছে একটি মিশ্রমত। এর আধুনিক নাম নাথপন্থ। ‘অমৃতকুণ্ড’ সম্ভবত এদেরই শাস্ত্র ও চর্যাগ্রন্থ। এটি গোরক্ষ-পন্থীর রচনা বলে অনুমিত হয়।বামাচার নয়— কায়াসাধন তথা দেহতাত্ত্বিক সাধনই এদের লক্ষ্য। ‘হঠ’ যোগের মাধ্যমেই এ সাধনা চলে। এক সময় এই নাথপন্থ ও সহজিয়া মতের প্রাদুর্ভাব ছিল বাঙলায়, চর্যাগীতি ও নাথসাহিত্য তার প্রমাণ। এ দুটো সম্প্রদায়ের লোক পরে ইসলামে ও বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়। কিন্তু পুরোনো বিশ্বাস-সংস্কার ত্যাগ করা সম্ভব হয়নি বলেই ইসলাম আর বৈষ্ণব ধর্মের আওতায় থেকেও এরা নিজেদের পুরোনো প্রথায় ধর্ম সাধনা করে চলে, এরই ফলে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত বাউল মতের উদ্ভব। অন্যদিকে অদ্বৈতবাদ ও যোগ পদ্ধতিকে সূফীরা নিজেদের মতের অসমন্বিত অঙ্গ করে নিয়ে যোগতত্ত্বে গুরুত্ব আরোপ করতে থাকে। এর ফলে মুসলিম সমাজে ও সাহিত্যে যোগের ও যোগসাধনার ব্যাপক প্রভাব ও চর্চা লক্ষ্য করি।