দেনা-পাওনা
পৃষ্ঠা: 142
ISBN: 9847034307559
বইয়ের পরিচয়
"দেনা-পাওনা" বইটির ভূমিকা থেকে নেয়াঃ‘দেনা-পাওনা' (১৯২৩) উপন্যাসটি শরৎচন্দ্রের অন্যান্য গ্রন্থ হইতে অনেকটা ভিন্নজাতীয়। নিজ বিবাহিত পরিত্যক্ত স্ত্রী, অধুনা চণ্ডীগড়ের ভৈরবী ষােড়শীর সংস্পর্শে, অত্যাচারী, লম্পট, পাপপুণ্যজ্ঞানহীন জমিদার জীবানন্দের অভূতপূর্ব পরিবর্তন এই উপন্যাসটির মূল বিষয়। দারুণ কুক্ৰিয়াসক্ত, পাপপঙ্কে আকণ্ঠ-নিমগ্ন জীবানন্দের অন্তরে যে প্রণয়প্রবৃত্তি ও ভদ্রজীবনযাপনের স্পৃহা সুপ্ত ছিল তাহা ষােড়শী-সংসর্গের মায়াদণ্ডস্পর্শে অকস্মাৎ নবজীবন লাভ করিয়া ফুলে-ফলে মঞ্জরিত হইয়া উঠিল। ষােড়শীর চরিত্র-গৌরবের অসাধারণত্ব বুঝাইবার জন্য লেখক দেবীমন্দিরের ভৈরবীদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে আমাদের মধ্যে যে বিশেষ ধর্মসংস্কার প্রচলিত আছে, তাহার প্রতি আমাদের মনােযােগ আকর্ষণ করিয়াছেন।এই ভৈরবীদের বাহ্য কৃচ্ছসাধন ও আত্মনিগ্রহের অন্তরালে একটা কুৎসিত ভােগলালসার উজ্জ্বলতা প্রায় প্রকাশ্যভাবেই অভিনীত, ইহা, ভৈরবী-জীবনের একটা বিশেষত্ব। এই কদাচার শাস্ত্রবিধি অনুসারে গর্হিত হইলেও প্রকৃত প্রস্তাবে উপেক্ষিত হইয়া থাকে- ইহাদের চরিত্রভ্রংশ একটা অবশ্যম্ভাবী অপরাধের ন্যায় একটু বিদ্রুপ-মিশ্রিত উপেক্ষার চক্ষেই সকলে দেখিয়া থাকে। কিন্তু প্রয়ােজন হইলে এই উপেক্ষিত অপরাধ হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত গুরুত্ব লাভ করে ও আমাদের সামাজিক দলাদলির আগুন জ্বালাইতে ইন্ধনের কাজ করে। এখানে ষােড়শী সম্বন্ধে ঠিক তাহাই ঘটিয়াছে। তাহার কল্পিত অপরাধের দণ্ড প্রদান করিতে আমাদের সমাজপতিরা হঠাৎ অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, তাহার দেবীর সেবাইত-পদের জন্য অযােগ্যতার বিষয়ে তাঁহাদের সুপ্ত বিবেকবুদ্ধি হঠাৎ অতিমাত্রায় জাগরিত হইয়া উঠিয়াছে- বিশেষত যখন এই ধর্মানুষ্ঠানের পুরস্কার, মন্দিরের সম্পত্তি ও দেবীর বহুকাল-সঞ্চিত অলংকারাদির সদ্য-লাভ। ধর্মজ্ঞানের পশ্চাতে যখন বিষয়স্পৃহা ঠেলা দেয় তখন তাহার বেগ অনিবার্য হইয়া থাকে। সুতরাং এই ধর্মপ্রাণ সমাজের সমস্ত সম্মিলিত শক্তি যে অতি নির্মমভাবে একটি অসহায়া রমণীর উপর গিয়া পড়িবে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছুই নাই। ষােড়শীর চরিত্রের প্রকৃত গৌরব এই যে, পাপপথে পদার্পণের জন্য পূর্ববর্তিনীদের নজির ও সমাজের প্রায় অবাধ সনন্দ দেওয়া থাকিলেও তাহার সহজ ধর্মবুদ্ধি তাহাকে সেই সনাতন পথে পা বাড়াইতে দেয় নাই। তাহার পর মন্দিরের সম্পত্তির অধিকারিণী বলিয়া ও পূজাসংক্রান্ত কার্যে সর্বদা পুরুষের সহিত সংস্রবের প্রয়ােজন থাকায় ষােড়শীর চরিত্রে অনেক পুরুষােচিত গুণের বিকাশ হইয়াছে- বিপদে স্থিরবুদ্ধি, অচঞ্চল সাহস ও একান্ত আত্মনির্ভরশীল একটা দুর্ভেদ্য নিঃসঙ্গতার সহিত রমণীসুলভ কোমলতা মিশিয়া তাহার চরিত্রকে অপূর্ব মাধুর্যে ও গাম্ভীর্যে মণ্ডিত করিয়া তুলিয়াছে। এই অপূর্ব চরিত্রই জীবানন্দকে প্রবল বেগে আকর্ষণ করিয়া তাহার পাষাণ প্রাণকে দ্রবীভূত করিয়াছে ও তাহাকে প্রথম প্রণয়ের স্বাদ দিয়াছে। জীবানন্দের অসংকোচ পাপানুষ্ঠানের মধ্যে অন্তত লুকোচুরির হীন কাপুরুষতা ছিল না, এবং এই সত্যভাষণের পৌরুষ ও কপটাচারের প্রতি অবজ্ঞাই তাহার চরিত্রে মহত্ত্বের বীজ; প্রেমের স্পর্শে ইহা একটি অকপট অনুতাপ ও সংশােধনের দৃঢ় সংকল্পরূপে আত্মপ্রকাশ করিল। তাহার মনে প্রেমের অলক্ষিত সঞ্চার, তাহার পক্ষে একান্ত অভিনব দ্বিধা-সংকোচ-জড়িত অন্তর্দ্বন্দ্ব অতি সুন্দরভাবে চিত্রিত হইয়াছে। গ্রাম্য সমাজপতিদের চরিত্রও অল্প কয়েকটি কথায় বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে। তবে নির্মল-হৈমবতীর আখ্যান মূল গল্পের সহিত নিবিড় ঐক্য লাভ করে নাই। ফকির সাহেবেরও উপন্যাসে বিশেষ কোনাে সার্থকতা নাই। তিনি বাস্তবতা-প্রধান যুগে আদর্শবাদপ্রিয়তার শেষ চিহ্নস্বরূপই প্রতীয়মান হন। ভৈরবী-জীবনের লৌকিক আচার-ব্যবহারগত বিশেষত্বই এই উপন্যাসের বৈচিত্র্যের হেতু হইয়াছে এবং এই ভিত্তির উপরই শরৎচন্দ্র ষােড়শীচরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন।নির্মল ও হৈমর দাম্পত্য-জীবনের দৃষ্টান্ত ষােড়শীর মনে সংসার বাঁধিবার বাসনাকে উদ্ৰিক্ত করিয়া তাহার জীবনের ভবিষ্যৎ পরিণতির হেতুস্বরূপ হইয়াছে। এবং উপন্যাস-মধ্যে এই খণ্ড-কাহিনীর প্রবর্তনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ইহাই-এইরূপ অভিমত অনেক সমালােচক কর্তৃক গৃহীত হইয়াছে। হয়তাে ষােড়শী যখন নবােম্মুেষিত স্বামিপ্রেমে কিছুটা উন্মনা ও চলচ্চিত্ত হইয়া পড়িয়াছে, যখন তাহার ভৈরবী-জীবনের আদর্শ ও সংস্কার এই প্রণয়াকাক্ষার প্রাবল্যে কতকটা শিথিল হইয়াছে মনের সেই দোদুল অবস্থায় হৈমর দাম্পত্য-জীবনের নিরুদ্বেগ সুখ-শান্তি তাহাকে খানিকটা স্পর্শ করিয়া থাকিবে। বিশেষত সমাজের সম্মিলিত বিরুদ্ধতার মধ্যে একমাত্র হৈমর হিতৈষণা ও সমবেদনা তাহাকে হৈমর জীবনাদর্শের প্রতি কতকটা আকৃষ্ট করিয়া থাকিতে পারে। কিন্তু সমস্ত বিষয়টি অভিনিবেশ সহকারে আলােচনা করিলে এই অভিমতকে যথার্থ বলিয়া মনে হয় না। প্রথমত, ষােড়শীর চিত্তে স্বামিপ্রেম-সঞ্চার হৈমর সহিত পরিচয়ের পূর্বেই ঘটিয়াছে। দ্বিতীয়ত, ষােড়শীর স্বচ্ছদৃষ্টির ও তীক্ষ অনুভূতির নিকট হৈমর তথাকথিত দাম্পত্য-প্রেমসৌভাগ্যের অন্তঃসারশূন্যতা গােপন থাকে নাই। যে নির্মল তাহার প্রণয়ের লােভে ঘন ঘন তাহার সঙ্গে সাক্ষাতের অবসর খাজে, দয়া-দাক্ষিণ্যের প্রচুর আশ্বাসের বারিসেকে তাহার মনে প্রণয়ের বীজটি অঙ্কুরিত করিয়া তুলিতে চাহে, হৈমকে ফাঁকি দিয়া যে রঙিন আবেশটিকে ঘনীভূত করার স্বপ্ন দেখে সেই নির্মলকে অংশীদাররূপে লইয়া যে প্রেমের কারবার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তাহার বাহিরের বিজ্ঞাপনের চটক ড়েও অন্তরে যে তাহা দেউলিয়া এ সত্য ষােড়শীর নিকট নিশ্চয় দিবালােকের মতাে স্বচ্ছ হইয়া উঠিয়াছে। সুতরাং হৈম-নির্মলের দাম্পত্য-জীবনে যে ষােড়শীর লােভ করিবার মতাে বিশেষ কিছু ছিল ইহা বিশ্বাস করা কঠিন। তৃতীয়ত, ষােড়শীর আত্মনির্ভরশীল, বলিষ্ঠ প্রকৃতির উপর 'অপরের জীবনের প্রভাব যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হইবে ইহাও সম্ভব মনে হয় না। বহুকালবিস্মৃত প্রথম কৈশােরের মুগ্ধ প্রণয়াবেশের স্মারক অলকা নামটি যে তাহার দীর্ঘদিনরুদ্ধ প্রেমের কপাটটিকে যেন মন্ত্রবলে উন্মুক্ত করিয়াছে ইহাও তাহার অনন্যনির্ভর স্বাধীনচিত্ততারই নিদর্শন। এই নামমাধুর্যের অসাধ্যসাধনের কৃতিত্ব পরের নিক